মেয়ের নামে নাম রাখেন ‘সোনাই বুটিক’

প্রত্যকের জীবনেই থাকে হাজারটা স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে মানুষ। এই স্বপ্ন একেকজনের কাছে ধরা দেয় একেকভাবে, একেক সময়ে। ক্ষেত্র বিশেষে স্বপ্ন মানুষকে নিয়ে যায় অনেক দূর।

কর্মী মানুষের কাছে যেমন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারাটা অনেক বড় বিষয়। অনেকেই এই স্বাধীন কাজের সন্ধানে থাকেন; কিন্তু গুটিকয় তার দেখা পান। এই ভাগ্যবানদের একটা বড় অংশই উদ্যোক্তা।

বর্তমানে দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। উদ্যোক্তা নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করছেন। ব্যবসার জন্য এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘুরে ঘুরে পণ্য সংগ্রহ করছেন। সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন নিজেরাই। কিন্তু এ পথ সহজ নয়। অনেক বাধা টপকে তাদের সামনে আসতে হয়, যার প্রতিটি বাঁকে আছে গল্প। এমনই একজন উদ্যোক্তা মিদ্দুলা মেঘ। মিদ্দুলার ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষ করে নিজে কিছু করার। মানে চাকরি না করে স্বাধীনভাবে কিছু একটা করার। কিন্তু এই সমাজে নারীদের নিজে নিজে কিছু করা তো আর খুব একটা সহজ বিষয় নয়। অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা পার হয়ে কিছু করতে হয়। তাই মিদ্দুলাকেও অপেক্ষা করতে হয়েছিল অনেক দিন।

বাটিক থ্রিপিসবাটিক থ্রিপিস। ছবি: সোনাই বুটিক-এর সৌজন্যে

মিদ্দুলার কাছে তাঁর উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটা শুনতে চাইলে বলেন, ‘আমার মেয়ে যখন স্কুলে ভর্তি হলো, তখন প্রতিদিন তাকে নিয়ে আমি স্কুলে যেতাম। আর অন্য অভিভাবকদের মতো স্কুল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাকে সেখানেই অপেক্ষা করতে হতো। এই অপেক্ষার সময়গুলোতে আমি অন্যদের মতো খোশগল্পে মশগুল না হয়ে স্কুলের আশপাশের মার্কেটের দোকানগুলোতে কীভাবে জিনিসপত্র কেনা-বেচা হয়, তা দেখতাম। দেখতে দেখতেই মাথার ভেতর চেপে বসল ব্যবসার ভূত। সেখানেই শুরু উদ্যোক্তা হওয়ার পরিকল্পনা।’

অন্য দশজন মানুষের মতো মিদ্দুলা কখনো ভাবেননি পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করবেন। কাজের নেশায় চাকরির পরীক্ষার জন্য সময় দেননি তিনি। কারণ অন্যের অধীনে নয়টা-পাঁচটা চাকরি করা ছিল মিদ্দুলার জন্য কঠিন। নিজে কিছু একটা করার তাগিদ থেকে একপর্যায়ে মন স্থির করেন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি।

অনেক পরিকল্পনার পর মিদ্দুলা ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সোনাই বুটিক’-এর যাত্রা শুরু করেন। শুরুতে একটি দোকান দেন। গ্রহণ করেন নানা পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শো-রুমের শুরু। তারপর অনলাইনে ব্যবসা এবং ধীরে ধীরে নিজের প্রোডাকশনের কাজ শুরু। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে দেশীয় পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের কাজে মনোনিবেশ করেন। ‘সোনাই বুটিক’-এর কাজ মিদ্দুলা একা শুরু করলেও বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

বসন্তের বুটিক থ্রিপিসবসন্তের বুটিক থ্রিপিস। ছবি: সোনাই বুটিক-এর সৌজন্যে

মিদ্দুলা মেঘের অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটিরও নাম ‘সোনাই বুটিক’। প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন নিজের একমাত্র মেয়ের নামে। সোনাই শব্দের আভিধানিক অর্থ স্নেহের যোগ্য। তা এই দু বছরের পথ চলায় ‘সোনাই বুটিক’ মানুষের কাছ থেকে আদর পেয়েছে বলতে হবে। না হলে এত দ্রুত এতটা এগোতে পারত না তা।

মিদ্দুলার উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে তাঁর মায়ের অবদানই সবচেয়ে বেশি। মায়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে মূল প্রেরণা ছিল আমার মা। মাকে ছোটবেলা থেকেই দেখেছি নিজের এবং আমাদের বোনেদের কাপড়গুলো সেলাই করতেন। নিজের পোশাক সেলাই করতে গিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ছোট একটি ব্যবসা। সেই ব্যবসাতে সেলাইকর্মী হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন আরও দুই নারী। মা বাড়িতে বসেই অন্য কাজের পাশাপাশি নিজের এই ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছিলেন। এ ছাড়া আমার পরিবার ও বন্ধুরা সব সময় আমার পাশে ছিল।’

‘সোনাই বুটিক’-এ নারীদের পোশাক তৈরি এবং বিপণন করা হয়। এখানে মূলত বুটিক এবং বাটিক থ্রিপিস, শাড়ি, টু-পিছ এবং ওয়ান পিছ তৈরি এবং বিক্রি করা হয়। সাধারণত দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করেন তাঁরা। শতভাগ সুতির পোশাকের পাশাপাশি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামদানিও বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি।

বুটিক থ্রিপিসবুটিক থ্রিপিস। ছবি: সোনাই বুটিক-এর সৌজন্যে

এই যে বেড়ে ওঠা এর জন্য কিন্তু কম বাধা পোহাতে হয়নি মিদ্দুলাকে। নারী উদ্যোক্তাদের পুরো জীবনই চ্যালেঞ্জিং। এখানে প্রতিনিয়ত প্রতি পদে একজন নারীকে সমাজের বাধার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে যারা অনলাইনে ব্যবসা করেন তাদের জন্য চ্যালেঞ্জের মাত্রাটা আরও বেশি।

ব্যবসার ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কর্মক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে মিদ্দুলা বলেন, ‘অনলাইনে প্রতিদিন বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। মনের ভেতর দুঃখ আসে, ক্ষোভ আসে, আবার নিজেকে সামলে নিই। ভাবি, পাছে লোকের কথায় নিজেকে বিসর্জন দেওয়ার কোনো মানে নেই। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়। আমাকেও লড়াই করতে হবে। এই পথে বাধা আসবে, বিপত্তি থাকবে। তাতে পিছপা হলে সে দায় আর কেউ নিবে না। প্রতিটি নারীরই কিছু না কিছু করা উচিত। যারা চাকরি করছেন না, তাঁরা তাঁদের সক্ষমতা অনুযায়ী ঘরে বসেই কিছু না কিছু করতে পারেন। বাধা-বিপত্তি থাকবেই। প্রতিটি বাধাকে টপকে যেতে হবে। নিজেকে চিনুন, নিজেকে আবিষ্কার করুন প্রতিনিয়ত। পরিকল্পনা করুন, উদ্যোগ নিন। সফলতা আসবে আশা করি।’

প্লেন বুটিক থ্রিপিস

প্লেন বুটিক থ্রিপিস। ছবি: সোনাই বুটিক-এর সৌজন্যে

‘সোনাই বুটিক’-এর পণ্য উৎপাদনের কারখানায় বর্তমানে ২৫ জন শ্রমিক যুক্ত। আর বিপণন ও বিক্রির কাজে আরও প্রায় ১০ জন যুক্ত। মিদ্দুলা মেঘ শুরুতে প্রায় ১৪ লাখ টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে ‘সোনাই বুটিক’ থেকে প্রতি মাসে তাঁর আয় হয় সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।

মিদ্দুলা চান অনেক দূর এগিয়ে যেতে। বললেন, ‘বর্তমানে পশ্চিমা সংস্কৃতি যেভাবে আমাদের গ্রাস করছে, তার বিপরীতে সোনাই বুটিক বাঙালি সংস্কৃতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে যদি সামান্য অবদানও রাখতে পারে, তাহলেই আমি মনে করব এই উদ্যোগ সফল। সোনাই বুটিক নিয়ে আমি অনেক দূর যেতে চাই। দেশীয় পণ্যের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে আমি দেশটাকে পরিচিত করে তুলতে চাই। সারা বিশ্বের মানুষের কাছে, বিশেষত গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের কাছে সোনাই বুটিককে নিয়ে যেতে চাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *