চট্টগ্রাম বন্দর জলসীমায় পণ্য নিয়ে আসা বাণিজ্যিক জাহাজে দস্যুতার ঘটনা গত ছয় মাসে শূন্যে নেমেছে। ২০২২ সালের পুরো বছরে তিনটি ঘটনায় উদ্বেগে পড়েছিলেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। আর চলতি ২০২৩ সালের জানুয়ারি-জুন মাসে দস্যুতার ঘটনা শূন্যে নামায় সেই উদ্বেগ কেটেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা বাংলাদেশ জলসীমায় দস্যুতার ঘটনা ঘটলে প্রধানত উদ্বেগে থাকেন জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারীরা।

কারণ দস্যুতার ঘটনা ঘটলে বিদেশি জাহাজ মালিকরা বাংলাদেশে জাহাজ ভাড়া নিতে অনীহা প্রকাশ করেন, জাহাজ পাঠালেও বাড়তি ভাড়া দাবি করেন। আর দস্যুতা বেশি বেড়ে গেলে বাংলাদেশমুখী জাহাজ পাঠাতে সারচার্জ বা বিশেষ মাসুল আরোপ করে বিদেশি জাহাজ মালিক, শিপিং লাইন ও কনটেইনার লাইনগুলো। আর পণ্য পরিবহনে ওই বাড়তি মাসুল যোগ হলে পণ্যের খরচ বেড়ে যায়। তাই উদ্বেগের পাশাপাশি ভাবমূর্তির সংকটেও পড়েন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা।

২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত সেই উদ্বেগ কাটলেও বছরজুড়ে এই অর্জন ধরে রাখার দাবি জাহাজ মালিক, শিপিং লাইন ও বন্দর ব্যবহারকারীদের।

জানতে চাইলে সাইফ মেরিটাইম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী আবদুল্লাহ জহীর বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরেই আমরা দস্যুতামুক্ত বন্দর জলসীমা পেয়েছি। এর ফলে বিদেশের শিপিং সেক্টরে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। একটি জাহাজে দস্যুতা ঘটলেই যে আবারও সারচার্জ আরোপ বা ক্ষতির মুখে পড়ব তা কিন্তু নয়।

তবে দস্যুতামুক্ত রাখতে না পারলে আমরা টেনশনে থাকি। সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত ঘটে।’
তিনি যোগ করেন, ‘দস্যুতার কারণে বাড়তি দামে জাহাজ ভাড়া নিতে গেলে এর প্রভাব কিন্তু পড়ে পণ্যের দামের ওপর। আর শেষ পর্যন্ত ভোক্তারাই এর দায় বহন করে। ফলে দস্যুতামুক্ত রাখাটাই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ।

বাণিজ্যিক জাহাজে সংগঠিত সশস্ত্র ডাকাতি, দস্যুতা ও চুরি প্রতিরোধে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংগঠন রিক্যাপ বিশ্বের সমুদ্রপথে দস্যুতা প্রতিরোধে কাজ করে। সংগঠনটির হিসাবে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ জলসীমায় কোনো দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। সংগঠনটি এর আগের ২০২২ সালের পুরো বছরে চট্টগ্রামে তিনটি দস্যুতার ঘটনা রেকর্ড করেছিল।

চট্টগ্রাম বন্দর জলসীমায় দস্যুতা রোধে যৌথভাবে কাজ করে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখানে কর্মরত প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের অভাব হলেই দস্যুতার ঘটনা বাড়ে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম বলেন, ‘কর্মরত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমেই দস্যুতাশূন্য জলসীমা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। দস্যুতা রোধে আমরা কোনো ছাড় দিইনি, আপসও করিনি। আগামী দিনেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘সীতাকুণ্ড থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত দীর্ঘ জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা বিদ্যমান ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সম্প্রসারণ করে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নিয়েছি। ফলে বন্দর ভবন থেকে বসেই ক্যামেরার মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের গতিবিধি জানা যাবে।’

রিক্যাপ রিপোর্টে চলতি ২০২৩ সালের জানুয়ারি-মে পাঁচ মাসে বিশ্বজুড়ে জলসীমায় ৪৫টি দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। ২০২২ সালে দস্যুতার ঘটনা ছিল ৩৯টি।

২০২৩ সালের পাঁচ মাসে ৪৫টি ঘটনার মধ্যে সবেচেয়ে বেশি ঘটেছে সিঙ্গাপুর মালাক্কা প্রণালিতে, যার সংখ্যা ৩০। ২০২২ সালের একই সময়ে ছিল ২৫টি। ফিলিপাইনে ঘটেছে ছয়টি, যা আগের পাঁচ মাসে ছিল তিনটি। ইন্দোনেশিয়ায় ঘটেছে পাঁচটি, যা আগের পাঁচ মাসেও একই ছিল। ভারতে আগের পাঁচ মাসে ঘটেছে তিনটি, এবার ঘটেছে দুটি। থাইল্যান্ডে আগের পাঁচ মাসে দস্যুতার ঘটনা থাকলেও এবার ঘটেছে একটি। ভিয়েতনামে ঘটেছে একটি। আর বাংলাদেশ জলসীমায় গত ২০২২ সালের ছয় মাসে তিনটি দস্যুতার ঘটনা ঘটলেও এবার কোনো দস্যুতা নেই।

রিক্যাপ প্রতিবেদন মতে, ২০১৪ সালেও চট্টগ্রাম বন্দর জলসীমায় ১৬টি দস্যুতার ঘটনা ঘটেছিল; ২০১৫ সালে তা ১০টিতে নেমে আসে।