চালু হচ্ছে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ, উম্মোচন হবে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত

দেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নের নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ্ররই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (কমোডিটি এক্সচেঞ্জ) বিধিমালা ২০২৩’ তৈরি করে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

বছরের গত ১৭ আগস্ট বিএসইসির ওয়েবসাইটে চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম স্বাক্ষরিত এই সংক্রান্ত খসড়া বিধিমালাটি প্রকাশ করা হয়। খসড়া বিধিমালাটির ওপর পাবলিক মতামত নিয়ে তা চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জের রেজিস্ট্রেশনসহ অন্যান্য সার্বিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে আগামী বছরের মধ্যে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু করা হবে। যেখানে কমোডিটি ডেরিভিটিভস প্রোডাক্ট লেনদেন হবে। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হলে দেশের সরবরাহ ও কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।

সূত্রে: বিএসইসি

 পাশাপাশি এটি পণ্যবাজারের বিভিন্ন কারসাজি দূর করতে সহায়তা করবে এবং কৃষকদের ভালো দাম প্রাপ্তিতে নিশ্চয়তা প্রদান করবে। আর ফসল কাটার আগেই কৃষক পণ্যের দাম জানতে পারবেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা জানতে পারবেন তারা কার কাছ থেকে পণ্য কিনছেন। সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে খুলবে নতুন দিগন্ত। এটি বিএসইসির অন্যতম একটি বড় অর্জন বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জ হলো অনেকটা স্টক এক্সচেঞ্জ বা শেয়ার কেনাবেচার বাজারের মতো। স্টক মার্কেটে বহু কোম্পানি মূলধন সংগ্রহ করতে শেয়ার বিক্রি করে, তা কিনে নেন বহুসংখ্যক বিনিয়োগকারী। কমোডিটি এক্সচেঞ্জও তেমনই। তবে এখানে শেয়ার নয়, পণ্য কেনাবেচা হয়।

তবে এই পণ্য কেনাবেচা সাধারণ পাইকারি বাজারের মতো নয়। বড় পাইকারি দোকানে (পাইকাররা যাকে মোকাম বলেন) ক্রেতা ও বিক্রেতা সরাসরি দর-কষাকষি করে পণ্য কেনাবেচা করেন।

তবে কমোডিটি এক্সচেঞ্জে ক্রেতা ও বিক্রেতার সরাসরি পণ্য কেনাবেচার সুযোগ নেই। অনেকটা শেয়ারের মতো বিক্রেতার দেওয়া পণ্যের সার্টিফিকেট (মান সনদসহ) বিক্রি হয়। মান সনদ দেখেই পণ্যের গুণগত মান বিষয়ে নিশ্চিত হন ক্রেতা এবং অন্য দেশে থেকেও শেয়ার কেনাবেচা করেন।

শেয়ারবাজারের মতো কমোডিটি এক্সচেঞ্জেও নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত ব্রোকারের মাধ্যমে পণ্য কেনাবেচা করতে হয়। থাকতে হবে নিজ বা প্রতিষ্ঠানের নামে অ্যাকাউন্ট। একেবারে স্টক মার্কেট থেকে শেয়ার কেনাবেচার মতো ব্যাপার। তবে এই বাজারে পণ্য কিনে তা ডেলিভারি না নিয়ে ক্রয়কৃত সার্টিফিকেট অন্য কারও কাছে বিক্রিও করা হয়। অনেকটা মিলগেটে ডেলিভারি অর্ডার বা ডিও কেনাবেচার মতো।

একটি আইনি প্রক্রিয়ার বাজার, যা নিয়ম বা পদ্ধতি নির্ধারণ করে এবং তা প্রয়োগের মাধ্যমে কমোডিটিজ বা পণ্য এবং এ সশ্লিষ্ট বিনিয়োগ পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে সহায়তা করে। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ বা ফিউচার মার্কেটের মাধ্যমে পণ্যের উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যে একটি প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ করা সহজ হয়।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জ বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠায় ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৪০০ কোটি টাকা হওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিশোধিত মূলধনের নিট সম্পদ হিসেবে সবসময় ৭৫ শতাংশ রাখতে হবে। কোম্পানি আইন ১৯৯৪ মোতাবেক কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই পবলিক লিমিটেড কোম্পানি হতে হবে।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার থাকবে, যারা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে বিনিয়োগ করবে। এই স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার কমোডিটি এক্সচেঞ্জের মোট পরিশোধিত মূলধনের সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবে। সিআইবি রিপোর্ট অনুসারে ব্যাংকের ঋণখেলাপি না হলে পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডাররা কমোডিটি এক্সচেঞ্জের সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবে।

চালু হচ্ছে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ, উম্মোচন হবে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত

এই এক্সচেঞ্জের কোনো পরিচালক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী জালিয়াতি, বিশ্বাস ভঙ্গ বা কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী হতে পারবেন না। এসব শর্ত পরিপালন সাপেক্ষে কমিশনের কাছে ১০ লাখ টাকার পেমেন্ট অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট বা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন করতে হবে।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠায় ১৩ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে ৭জন থাকবেন স্বতন্ত্র পরিচালক। আর ওই স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্যে থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে একজনকে নির্বাচিত করা হবে।

দেশে প্রথমবারের মতো কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) কর্তৃপক্ষ। বিএসইসি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বেশ কিছু শর্ত সাপেক্ষে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু করার অনুমোদন দেয়।

তথ্যানুযায়ী

এজন্য পরামর্শক হিসেবে ভারতের মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জের (এমসিএক্স) সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে সিএসই। চুক্তির পর এমসিএক্সের সহযোগিতায় নিজস্ব প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিনিধিদের নিয়ে এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণও দিয়েছে সিএইসি।

এদিকে গত বছর এক-চতুর্থাংশ শেয়ার কেনার মধ্য দিয়ে সিএসইর কৌশলগত মালিকানায় এসেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপ।

ইতোমধ্যে গত ২৫ জুলাই বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সিকিউরিটিজ কমিশন ভবনে ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জ: প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন, এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ, ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএস, সিসিবিএল, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, বসুন্ধরা গ্রুপ ও মেঘনা ব্যাংক এবং গ্রুপসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এই সময় তারা ডেরিভেটিভস ও ডেরিভেটিভস মার্কেটের ধারণা, কমোডিটি এক্সচেঞ্জের প্রোডাক্ট ও তার লেনদেন, বাংলাদেশে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেটের সুযোগ-সম্ভাবনা, এক্সচেঞ্জে কমোডিটি ডেরিভেটিভের ট্রেডিং মেকানিজম, কমোডিটি ডেরিভেটিভসমূহের ট্রেডিংয়ের ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেন।

এছাড়া, বাংলাদেশে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট চালু করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ এবং সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *