ডিসেম্বর পর্যন্ত তেল উৎপাদন কম করবে সৌদি আরব ও রাশিয়া

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে সৌদি আরব উৎপাদন কমিয়ে দেয়ায় উল্টো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশটির অর্থনীতিতে। কিন্তু তা সত্ত্বেও উৎপাদন কম রাখার সিদ্ধান্তে অনড় দেশটি।

বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারক সৌদি আরব এবং রাশিয়া জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ দৈনিক ১ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল উত্তোলন কম করবে তারা।

ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার মধ্যে সৌদি আরব ও রাশিয়া আবারও জানিয়ে দিয়েছে যে তারা চলতি বছরের শেষ নাগাদ পর্যন্ত দৈনিক ১ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি জ্বালানি তেলের উত্তোলন কম রাখবে।

সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছে,

ডিসেম্বর মাসেও সেচ্ছায় দৈনিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল কম উত্তোলন করা হবে। ফলে এই মাসে দৈনিক প্রায় ৯ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন করা হবে।

বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে, মূলত তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা এবং ভারসাম্য আনতেই ওপেক প্লাসের সদস্য দেশগুলো এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে উঠতে পারে ১৫০ ডলারে

সৌদি প্রেস এজেন্সির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরব আগামী মাসে তাদের জ্বালানি তেলের উৎপাদনের পরিমাণ পর্যালোচনা করবে। পরে তারা বিবেচনা করবে তেল উত্তোলনের পরিমাণ বাড়ানো হবে, না কি কমানো হবে।

বাজারে ভারসাম্য রাখতে তেল উৎপাদন বাড়াবে না সৌদি আরব ও রাশিয়া

পরে আলাদা এক বিবৃতিতে একই কথা জানিয়েছেন রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক। মস্কো জানিয়েছে, ডিসেম্বর নাগাদ রাশিয়া অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য রফতানি থেকে দৈনিক ৩ লাখ ব্যারেল কম সরবরাহ করবে।

বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ‘দ্য অরগানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম কান্ট্রিস’ যা ওপেক নামে পরিচিত। আবার ওপেকের বাইরে অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশ ও ওপেকের সদস্যদের একত্রে ওপেক প্লাস নামে অভিহিত করা হয়।

গত বছর থেকে ওপেক প্লাসের সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে  উৎপাদন কমিয়ে চলেছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইসরাইল ও হামাসের মধ্যকার সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠামানা করেছে। কারণ বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সরবরাহ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আর ইরানের এই সংঘাতেরসরাসরি জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বাড়লেও স্থিতিশীল থাকার আভাস

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ৯৮ ডলারের কাছাকাছি উঠে যায়। পরে যদিও তা নেমে আসে। শুক্রবার (৩ নভেম্বর) বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৮৫ ডলার।

যদিও সংঘাত বাড়লে সৌদি আরব ও রাশিয়া এই পরিকল্পনার পরিবর্তন আনতে পারে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি। তবে আপততদৃষ্টিতে ওপেক প্লাস তেল উত্তোলন কম রাখতেই আগ্রহী।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মতে, নিওম নামের একটি ব্যয়বহুল প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য তেলের দাম ১০০ ডলারের মতো রাখা প্রয়োজন সৌদি আরবের। এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনেরও ইউক্রেনের বিপক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রয়োজন পেট্রোলিয়াম রাজস্বের।

এদিকে গত সপ্তাহে সৌদির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির পর এটিই দেশটির অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকোচন।

তেলের উৎপাদন কমিয়ে উল্টো ধাক্কা সৌদি অর্থনীতিতে

তবে সৌদি আরবের জ্বালানি তেলবহির্ভূত কার্যক্রমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ায় দেশটির অর্থনৈতিক মন্দা কিছুটা হলেও সামাল দেয় গেছে।

বিগত কয়েক মাস ধরেই সৌদির বিশাল জ্বালানি খাত সংকুচিত হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও সামগ্রিক অর্থনীতি বছর ব্যবধানে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখে।

বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসে রাজ্যের জ্বালানি খাত ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। যা ২০১১ সালের পর কোনো প্রান্তিকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ানোর জন্য তাদের তেল উৎপাদন কমিয়ে আনা।

জ্বালানি তেলে মুনাফা কমে যাচ্ছে এবং উচ্চ ফ্রেইট চার্জের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে অপরিশোধিত  তেলবাহী জাহাজ পাঠানো কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে এসব কারণে সৌদি আরব তেল উৎপাদনে তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারে।

ব্লুমবার্গ

এছাড়া ইউরেশিয়া গ্রুপের মতে, বাজারের অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হওয়ার কারণে সৌদি আরব তাদের জ্বালানি তেলের উৎপাদন দৈনিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল কম রাখার এই একতরফা পদক্ষেপ ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *