ভরা মৌসুমে ইলিশের আকাল দাম বাড়াচ্ছে অন্য মাছের

(ইলেকট্রিশিয়ান) আনারুল ইসলাম গত সপ্তাহের শেষ দিকে রাজধানীর রামপুরা বাজারে রুই মাছের দরদাম করছিলেন। বিক্রেতা প্রতি কেজির দাম হাঁকেন ৪৫০ টাকা। আনারুল প্রতি কেজির দাম সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা দিতে চান। এভাবে দামাদামির একপর্যায়ে বিক্রেতা জানান, প্রতি কেজি ৪০০ টাকা রাখতে পারবেন। কথাটি শোনামাত্রই ক্রেতা আনারুল অন্য দোকানের দিকে হাঁটতে শুরু করেন।

তখন অকুস্থলে উপস্থিত এ প্রতিবেদকও পিছু নেন আনারুল ইসলামের। অন্য আরেকজন বিক্রেতার কাছে গিয়েও আনারুল রুই মাছের দরদামই শুরু করেন। সেখানেও তিনি দামে পোষাতে পারলেন না। শেষমেশ ২৭০ টাকা কেজি দরে এক কেজি কই মাছ কেনেন তিনি। আনারুল ইসলাম বলেন, ‘চড়া দামের কারণে ইলিশ বা দেশি মাছ খাওয়ার স্বপ্ন এখন বিলাসিতা। দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন চাষের মাছও কিনতে পারি না।’

যেসব মাছ নিয়ে গবেষণায় সফলতা আসছে, সেগুলো হ্যাচারিতে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাতে মাছের বাজারে বৈচিত্র্য বাড়বে। পাশাপাশি দামও কমবে। এ ছাড়া মাছের প্রাকৃতিক প্রজননকেন্দ্রগুলো সংরক্ষণে আরও উদ্যোগী হতে হবে।

কাজী আহসান হাবীব, চেয়ারম্যান, ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

এবার ভরা মৌসুমেও বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেশ কম। ফলে গতবারের তুলনায় দাম বেশ কিছুটা বাড়তি দেখা যায়। মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে, তাতে ইলিশের সরবরাহ কমেছে এক-চতুর্থাংশ। আর গতবারের তুলনায় ইলিশের দাম বেড়েছে অন্তত ৫০ শতাংশ।

বাজারে এখনো এক কেজির একটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। ইলিশের আকালে চাপ পড়েছে দেশি অন্যান্য মাছের ওপর। এতে দাম বেড়েছে প্রায় সব মাছের। ১২ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরা ২২ দিন বন্ধ থাকবে। তাতে বাজারে আপাতত মাছের দাম কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ, বরং বাড়ার আশঙ্কাই প্রবল।

এবার ইলিশের দাম নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামছে ভোক্তা অধিদপ্তর

রাজধানীর মগবাজার, শাহজাহানপুর, মালিবাগ ও রামপুরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক কেজি ওজনের একটি ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে দেড় হাজার টাকা। তবে দামাদামি করলে ৫০-১০০ টাকা কমে, এই যা। আর দেশি বিভিন্ন মাছের মধ্যে প্রতি কেজি আইড় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, বোয়াল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, বেলে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা ও কাচকি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির মধ্যে প্রতি কেজি বাগদা ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ ও গলদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়।

চাষের মাছের মধ্যে রুই ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায় মিলছে। তবে কোথাও কোথাও কিছুটা কমেও রুই মাছ পাওয়া যায়। চাষের অন্য মাছগুলোর মধ্যে আকারভেদে পাবদা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, কই ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, পাঙাশ ও তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

এর পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছের দামও বাড়তি। মাঝারি মানের প্রতি কেজি রূপচাঁদা মাছের দাম হাঁকা হয় এক হাজার টাকা। বড় আকারের সুরমা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাঝারি মানের টুনা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা ও পোয়া মাছ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে একটু সস্তায় পাওয়া যায় লইট্যা, প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা।

রাজধানীর মালিবাগ বাজারের বিক্রেতা আবদুল মাজেদ বলেন, এবার বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকার কারণে অন্যান্য মাছের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তাতে দাম কিছুটা বেড়েছে।

মাছের গড় দাম কতটা বেড়েছে, তার একটি উদাহরণ হতে পারে পাঙাশ। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর মাছের জাতীয় খুচরা বাজারের গড় দরের হিসাব রাখে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে এক কেজি ছোট পাঙাশের দাম ছিল ১১০ টাকা, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১১১ টাকা। অর্থাৎ মোটামুটিভাবে বাজারে স্থিতিশীল দামের মাছের মধ্যে একটি ছিল পাঙাশ। সেই মাছই এখন কিনতে হচ্ছে আকারভেদে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে।

বিষখালীর ইলিশ দেখতে যেমন, খেতেও তেমন

বাজারে সব ধরনের মাছের দাম গত ৬ মাসে অন্তত ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে বলে জানান মাছ ব্যবসায়ীরা। চাষের মাছের মূল্যবৃদ্ধির জন্য খাবারের দাম বেড়ে যাওয়াকে একটি বড় কারণ বলে জানান তাঁরা। তবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া মাছের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে ইলিশের সরবরাহ কমাকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ফিশ ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. শামসুর রহমান মোল্লা বলেন, চাষের মাছের খাদ্যের দাম বেড়েছে। এতে গত এক বছরে মাছ উৎপাদনের খরচ ৫০ শতাংশের মতো বেড়েছে। তাই সব মাছের দাম বেড়েছে।

মাছের দাম যে বহু বছর স্থিতিশীল ছিল, তার কারণ উৎপাদনে সাফল্য। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১০ বছর আগে ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে মাছের উৎপাদন ছিল ৩২ লাখ টনের কিছু বেশি। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসে এই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। চাষের মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া ও পাঙাশই বেশি উৎপাদিত হয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়।

মাছের উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী আহসান হাবীব বলেন, যেসব মাছ নিয়ে গবেষণায় সফলতা আসছে, সেগুলো হ্যাচারিতে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাতে মাছের বৈচিত্র্য বাড়বে। পাশাপাশি দামও কমবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *